
নুরুল আমিন সোহেল, চট্টগ্রাম:
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটছে, তার ইতিবাচক প্রভাব এখন বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান। এক সময়ের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), দ্রুতগতির ফাইভ-জি ইন্টারনেট, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং অটোমেশনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারিক প্রয়োগে। কৃষি খাতে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা ও ফসলের রোগবালাই দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক কৃষকরা যেমন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন, তেমনি উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এসেছে বিরাট পরিবর্তন; প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষায়িত চিকিৎসকের পরামর্শ এবং উন্নত ল্যাব রিপোর্ট বিশ্লেষণের কাজ এখন মুহূর্তেই করা যাচ্ছে।
একই সাথে সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া এখন সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়। এনআইডি সংশোধনের আবেদন, নতুন পাসপোর্ট, জমির খতিয়ান তোলা কিংবা বিভিন্ন ধরণের ফি ও ট্যাক্স প্রদান—সবকিছুই এখন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই সম্পন্ন হচ্ছে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমে আসার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বহুগুণ বেড়েছে।
দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে তরুণ প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা। ডিজিটাল কানেক্টিভিটি ভালো হওয়ার কারণে দেশের লাখ লাখ তরুণ ঘরে বসেই বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ করছেন এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো খাতগুলোতে বাংলাদেশী তরুণদের আধিপত্য এখন চোখে পড়ার মতো।
তবে এই দ্রুত অগ্রগতির মাঝে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। শহর ও গ্রামপর্যায়ে ইন্টারনেটের গতি ও মূল্যের ক্ষেত্রে একটি বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। এছাড়া প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সাথে সাথে সাইবার হামলার ঝুঁকি, ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়া এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়গুলো বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ঐতিহ্যবাহী কিছু চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার জন্য দ্রুত দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনই কারিগরি ও এআই-ভিত্তিক নতুন কারিকুলাম ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সাথে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত মূলধনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ডিজিটাল বিপ্লবের এই সঠিক ব্যবহার অব্যাহত রাখতে পারলে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও স্বাবলম্বী এক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

