চাহিদা বেড়েছে হাতপাখার

0
1

তীব্র গরম আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে দেশজুড়ে বেড়েছে হাতে তৈরি তালপাখার কদর। আর সেই বাড়তি চাহিদার বড় অংশই মেটাচ্ছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের হাঁপানিয়া ফকিরপাড়া গ্রামে। তবে চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে, পাখা তৈরি করতে করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে—চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা। নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাঁপানিয়া গ্রামটি তালগাছবিহীন হলেও ‘তালপাখার গ্রাম’ হিসেবেই সুপরিচিত। গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যেখানে নারীরাই মূল চালিকাশক্তি। বছরের প্রায় ছয় মাস তারা সংসারের নিত্য কাজের পাশাপাশি তালপাখা তৈরি করে বাড়তি আয় নিশ্চিত করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই যেন ছোট ছোট কারখানা। কোথাও তালপাতা কাটা হচ্ছে, কোথাও শুকানো, আবার কোথাও রঙিন খিল বসিয়ে পাখা তৈরি করা হচ্ছে। নারী-পুরুষ মিলেই দিন-রাত কাজ করেও চাহিদা মেটাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হওয়া পাখা বাজারে যাওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কারিগররা জানান, তালপাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল তালপাতা ও ডাগুর, যা প্রতি বছর পৌষ মাসের শুরুতে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিটি তালপাতা কিনতে খরচ পড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এরপর তা নির্দিষ্ট মাপে কেটে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর বাঁশের কাঠি দিয়ে পাতাগুলো প্রসারিত করে রঙিন খিল ও সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় চূড়ান্ত পাখা। একটি তালপাখা তৈরি করতে কাঁচামালসহ মোট খরচ পড়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। কারিগররা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। কারিগরদের ভাষ্য, গত বছর তালপাখার চাহিদা কম থাকায় তারা কাঁচামালও কম সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে হঠাৎ করেই তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেওয়ায় চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ফলে এখন কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামের প্রবীণ কারিগর সাবেজান বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকে এই কাজ করছি। এই পাখা বানিয়েই সন্তানদের বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। আগে এত চাহিদা ছিল না, কিন্তু এখন গরম আর লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ বেশি করে পাখা কিনছে। আমরা যত বানাই, ততই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাখাশিল্পী আলাউদ্দিন বলেন, গতবার চাহিদা কম থাকায় কম কাঁচামাল এনেছিলাম। এবার চাহিদা অনেক বেশি। দিন-রাত কাজ করেও বাজারের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। প্রধানত রাজধানী ঢাকা, টাঙ্গাইল, খুলনা, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই গ্রামের তালপাখা সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক পাইকারই সময়মতো পণ্য পাচ্ছেন না। এদিকে শ্রমের তুলনায় মজুরি কম হওয়ায় কারিগররা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জানা গেছে, ১০০ পিস পাখা তৈরি করলে মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৮০০ টাকা। ৪ থেকে ৬ জন নারী একসঙ্গে কাজ করলে সারাদিনে ২০০ পিস পাখা তৈরি করা সম্ভব হলেও কাঁচামাল সংকট ও চাহিদার চাপ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী বলেন, তালপাখা শিল্প এই অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা না থাকায় কারিগররা পিছিয়ে আছেন। সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও প্রসারিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here