
জাহেদুল ইসলাম শ্রাবণ
একসময় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা এখন একাধিক গুরুতর মামলার আসামি। দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বেনজীর আহমেদকে অবশেষে বিদেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৮৮ সালে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর ক্ষমতার বিস্তারের পাশাপাশি সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটানো এবং নানা অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসতে থাকে। ২০২৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হলে তিনি পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত। ২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সে সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন।
এ ছাড়া র্যাবের বিশেষ হেফাজতকেন্দ্রে ব্যক্তিদের গুম করে রাখার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান আরেকটি মামলারও আসামি তিনি। ওই মামলায় একাধিক সাবেক সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যার নামে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করা হয়েছে এবং সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে।
তদন্তে ঢাকার অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যাংক হিসাব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, বিও অ্যাকাউন্ট এবং সঞ্চয়পত্রের তথ্য পাওয়া যায়। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদের বড় একটি অংশ জব্দ করা হয়েছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ
দুদকের করা পৃথক মামলায় বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর তার বিনিয়োগ বা বৈধ ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ওই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
জমি দখল ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
নিজ জেলা গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিঘা জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভয়ভীতি, প্রভাব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারকে জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
গোপালগঞ্জে গড়ে তোলা একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে প্রকল্পটির বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করা হয়। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন সম্পত্তি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও।
বিতর্কিত ডক্টরেট ডিগ্রি
বেনজীর আহমেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বিশেষ সুবিধায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডক্টরেট প্রোগ্রামে ভর্তি হন। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের পর তাঁর অর্জিত ডিগ্রি স্থগিত করা হয়।
পাসপোর্ট কেলেঙ্কারি
সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে অতি দ্রুত পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন। র্যাবের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার কারণে তাঁর ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
দেশে ফিরলে কী অপেক্ষা করছে?
বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হলে বেনজীর আহমেদকে একাধিক মামলায় আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জমি দখল এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই সাবেক পুলিশপ্রধান এখন নিজেই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর অপেক্ষায়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিচার এবং সেসবের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন দেশের আইন ও আদালতের ওপরই নির্ভর করছে।


