
স্পোর্টস ডেস্ক:
১৯৬৬ সালে পর্দায় আসা গল্প হলেও সত্য চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত সংলাপ—‘আমার কাজ যে ফুরিয়েছে…’—আজ যেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিষাদময় বাস্তবতায় পরিণত হলো। প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টাইন ফুটবলের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকা লিওনেল মেসি শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের আঙিনাকে বিদায় জানিয়েছেন। এক জাদুকরী অধ্যায়ের ইতি টেনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অর্জনের খাতা পরিপূর্ণ করে নিজের সবটুকু উজাড় করেই বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
ক্যারিয়ারের সূর্যোদয়টা মোটেও রঙিন ছিল না। ২০০৫ সালের আগস্টে ১৮ বছর বয়সে যখন অভিষেক হলো, মাঠে নামার মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল সেই তরুণকে। সেই শুরু থেকে পরবর্তী ২১ বছরে কত রোদ-বৃষ্টি, কত ঝড়ঝাপ্টা! নিজের দেশের মানুষের তীক্ষ্ণ সমালোচনা, বারবার খেতাব হাতছাড়া হওয়ার যন্ত্রণা আর ফাইনাল হেরে অভিমানী অবসর—সব মিলিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক যাত্রা ছিল এক মহাকাব্যিক নাটকের মতো। তবে প্রতিবারই ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে অপূর্ণতার প্রতিটি পাতার শূন্যতা পূরণ করেছেন পরম দক্ষতায়।
বার্সেলোনায় সফলতার চূড়া স্পর্শ করলেও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দীর্ঘদিন ট্রফির দেখা পাচ্ছিলেন না মেসি। ২০১৪ বিশ্বকাপ কিংবা টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে যাওয়ার সেই মানসিক কষ্ট কাটিয়ে আর্জেন্টিনার মোড় ঘোরে ২০১৮ সালের পর। নতুন কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে গড়ে ওঠা তরুণ স্কোয়াড মেসির কাঁধে সব দায়িত্ব না চাপিয়ে, তাঁর বিজয়ের জন্য নিজেরা সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়। সেই প্রতিজ্ঞার ফসল হিসেবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য ট্রফি জয়ের অভিযান। এরপর একে একে ফিনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপ এবং পরবর্তী কোপা আমেরিকা জয় করে মাত্র তিন বছরে ৪টি বড় শিরোপা ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তেরা।

তবে কোটি ভক্তকে পরম আনন্দ দিলেও, মাঠের ঘাস থেকে বুট জোড়া তুলে না নেওয়ার আক্ষেপটা থেকে গেছে অক্ষত। জানা যায়, গত ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পরই মেসি তাঁর বিদায়সংবাদটি লিখে রেখেছিলেন। তবে কিছুদিন আগে বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণ সেই বিদায়ের সিদ্ধান্তকে আর ঝুলন্ত রাখেনি। বাবার চলে যাওয়া তাঁকে মানসিকভাব নিশ্চিত করে যে, নীল-সাদা পোশাকটি তুলে রাখার উপযুক্ত সময় এটাই।
পরিসংখ্যানের আয়নায় তাকালে এই যাত্রাকে অলৌকিক বললেও কম বলা হয়। জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচে রেকর্ড ১২৫ গোল ও ৬৮টি অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য মাইলফলক গড়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলের ইতিহাস। ঝুলিতে পুরেছেন ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, ২০০৮ অলিম্পিক সোনা, দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং ঐতিহাসিক ২০২২ বিশ্বকাপ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেরা মঞ্চে ২০১৪ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে টুর্নামেন্ট সেরা হিসেবে দুটি ‘গোল্ডেন বল’ জেতার অনন্য কীর্তিও কেবল তাঁরই।
‘তুমি রবে-নীরবে, হৃদয়ে মম’—রবীন্দ্রনাথের এই গানের সুরেই আজ বিদায় জানানো হচ্ছে ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা রাজপুত্রকে। ২১ বছরের ফুটবলীয় রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে মেসি সরে দাঁড়িয়েছেন সত্যি, কিন্তু পুরো একটি প্রজন্মকে বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দেওয়া এই রূপকার ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন যুগের পর যুগ।

