
বিশেষ প্রতিনিধি
গুমের মতো ভয়াল অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এবং দেশের মানবাধিকার সুরক্ষায় এক দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আজ রবিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬’-এর বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে এ অঙ্গীকার তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ থাকবে না এবং কোনো পরিবারকে আর তাদের স্বজনদের জন্য চিরন্তন অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
গুমের ভয়াবহতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
রাষ্ট্রপতি গুমকে কেবল একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে এটিকে মানবতাবিরোধী চরম অপরাধ বলে আখ্যা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, গুম একটি পরিবারের হাসি, শান্তি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার মৌলিক অধিকার গুমের মাধ্যমে সরাসরি লঙ্ঘিত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।
বিগত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা ও নিপীড়ন
স্বতন্ত্র আঙ্গিকে অতীত পর্যালোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় গুম ও নিপীড়নকে রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর চড়াও হয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অপরাধ সংঘটিত ও অস্বীকার করা হয়েছিল।
বক্তব্যে গুমের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন নিখোঁজ ও নির্যাতিত হওয়া বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকদের কথা স্মরণ করা হয়:
- সুদীর্ঘ নিখোঁজ তালিকা: বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষ, যাদের পরিবার এখনও অনিশ্চিত প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
- ‘আয়নাঘর’-এর নির্মমতা: আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীর মতো বহু ভিন্ন মতাবলম্বী, সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ মানুষকে আলো-বাতাসহীন অন্ধকার ঘরে দীর্ঘ সময় বন্দি রাখার চিত্র তুলে ধরা হয়।
- জীবন্ত দৃষ্টান্ত: অনুষ্ঠানে উপস্থিত বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তাকেও একসময় গুম করে দেশের বাইরে ফেলে আসা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিচার নিশ্চিতের তাগিদ
রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সাম্য, বাকস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, গুমের সংস্কৃতির মাধ্যমে সেই চেতনাকেই ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। তিনি স্মরণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে, যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের এ ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন।
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ বিদায় নেওয়ার পর এখন প্রতিশোধ নয়, বরং আইনি উপায়ে প্রতিকার নিশ্চিত করার সময় এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কখনোই কোনো সন্তানকে বাবার জন্য কিংবা স্ত্রীকে স্বামীর জন্য অঝোরে চোখের পানি ফেলতে না হয়।

